Tuesday, 29 January 2019

দর্শী

আমি নারীর বুকের ব্যথা দেখেছি
রোজ নিশিতে ভোরে,
আমি নিষ্পাপ শিশুর মুখে দেখেছি
কীযে ডর তার অন্তরে।
.
আমি পথে পথে বহু হেটে দেখেছি
শত সহস্র মানুষের প্রতি, মানুষের বঞ্চনা
আমি মানুষের শ্বাসে কান পেতে শুনেছি
মুক্ত আকাশে মুক্তি হেতু; জানায় সংবর্ধনা।
.
আমি বৃদ্ধ মায়ের চোখে দেখেছি
বয়ে যাওয়া নীরবে ক্রন্দন
আমি দিগন্তে রোজ চেয়ে দেখেছি
বিধাতার অদৃশ্য স্পন্দন।
.
আমি নদীর জলে, বৃক্ষ তলে
দেখেছি রক্তের দাগ
আমি মেঘের কোলে, যুদ্ধ হলে
দেখেছি মেঘের রাগ।
.
আমি পিতার, নীরব মুখে দেখেছি
অভিযোগ শত জারি,
দেখেছি তাদের বিরহ ব্যথা; শুনেছি
তাদের কষ্ট রোনাজারি।

সমাচার

তোমার জন্য রচিত আমার
গল্প কবিতা গান,
তোমার জন্য অর্পিত আমার
ক্ষুদ্র দেহের প্রাণ।
.
তোমার জন্য ব্যাকুল আমার চিত্ত
তোমার জন্য আহুতি হয়েছে রিক্ত
সকাল দুপুর সন্ধ্যায়,,, নিত্য।
তুমি আমার প্রিয়,,, প্রিয় অস্তিত্ব।
.
তোমার জন্য আমি ধন্য
তোমার জন্য আমার বিস্তার
ধ্যানে জ্ঞানে অানমনে অস্থির
তোমার কথারই শুধু সমাচার।

জীবনের গল্প


“অন্তরালেই সাজে বিনাশের ক্ষণ
অজানাতে কেঁদে যায় সত্য,
বুকে রাখি মায়ার অনিত্য........”

খুব সাধারণ একজন মানুষ আমি, আর নিজের সম্বন্ধে তেমন কিছু বলার মতো নেইও আমার। কিছু নেই বলেই বোধহয় দেয়ার ইচ্ছেটা মাঝে মাঝে খুব তীব্র হয়। দেখেছি, বাস্তবে যাদের দিতে হয় না, দানের মহিমাকীর্তন তারাই সবচেয়ে বেশি করে। তবু এত নীতিকথা, এত হিসেব-নিকেশকে পাশে ফেলে- ঠিক করেছি নিজের জীবনটাকে একটু উপর থেকে দেখা যাক না! কিংবা দেখানো যাক আমার মতোই অন্য আর কাউকে। দেখি, কেউ ছুঁতে পারে কিনা আমাকে, ঘ্রাণ পায় কিনা আমার ভাবনার। আমাদের ছিলো তিন বোন, বাবা-মা, আর আমার অতি সাধারণ চেহারার একটা সীমানা। মাঝে মাঝে ভাবি, পৃথিবীটাই একটা বিশাল আকাশ, আর তার বিশালত্বে পরিবারগুলো এক একটা নক্ষত্র। আমার এই অতি-সাধারণ পরিবারটি এই নক্ষত্রসমুদ্রের একটি তারা। একটি তেজহীন, মরা মরা আলোর একটা তারা- একটা হতদরিদ্র পরিবার। হতদরিদ্র বলে আক্ষেপ করছিনা, বাস্তবতাটাকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি মাত্র। চিরদিন পেটের দানা জোগার করতে গিয়ে শিক্ষা, সংস্কৃতি, সভ্যতা- এই বুলিগুলো এ পরিবারের কাছে ছিলো বিলাসিতার নামান্তর। আমরা এগুলো বইয়ে সাজানো সুন্দর শব্দের বেশি কিছু ভেবে উঠতে পারিনি কখনো। আর আমার তো এতকিছু ভাববার অবসরই ছিলো না। এই তারার দেশে আমি বলা চলে ছিলাম, ছিটকে চলা স্ফুলিঙ্গ। ওয়াও! বলতে বলতে নিজের সম্বন্ধে বেশ জুৎসই বিশেষণ সৃষ্টি করা যাচ্ছে। তবে, সেটা মিথ্যেও তো নয়! দরিদ্র পরিবারে শত অভাবের মধ্যে একটা অভাব অনেক সময় বেশ স্বস্থির- সেটা হচ্ছে অতি-যত্নের অভাব। বেগার-খাটা জীবনে বাবা-মায়ের এত সময়টাই কোথায় যে সর্বক্ষণ হা-তু-তু-তু করবে? জীবনে, যাকে বলে উড়ন্ত পাখির মতো উড়েছি, দুরন্ত ঘোড়ার মতো ঘুরেছি। “কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা”-র মর্মটা বোধহয় আমার বা আমাদের মতো ঝরাস্ফুলিঙ্গ ছাড়া আর কেউ সেভাবে বলতে পারবে না। শুধু এই বোধটার কারণেই মাঝে মাঝে মনে হয়, নজরুল দারিদ্রের এত প্রশংসা মাতাল বা বেতাল হয়ে করেননি। কোন এক রাতে তার আমার মতোই মনে হয়েছিলো- এই দারিদ্রতাটা না থাকলে তাকে কলমের কালিতে ভাবের চিত্র না ফুটিয়ে, মণিবের সেরেস্তার খেরো খাতায় স্বভাবের বিসর্জন টানতে হতো।

তবে একেবারে বাংলা সিনেমার নায়কদের পুকুরে ডুব দিয়ে টুস করে বড় হয়ে গেছি এমনটাও নয়। আমাদের উপরে চিরজীবনই মায়ার আঁচল বিছিয়ে রেখেছেন আমাদের জন্মদাত্রী মা। তিনি তার মাকে হারিয়েছেন প্রায় ৪/৫ বছর বয়সে। মাঝে মাঝেই তিনি আমাদের বলতেন, “আমি আমার মাকে হারিয়েছি সেই ছোট্ট বয়সে। আমার ও তোর বড় খালাকে দেখাশোনা করার জন্য তোর নানা আবার বিয়ে করে। তোর নতুন নানী এসেই আমাকে ও তোর খালাকে পালক হিসাবে পাঠায় দূরের একটা গ্রামে। এবার আমাদের দেখাশোনাকারীর দেখাশোনায় আমাদের বাবাকেও হারাতে হয়। তোর নতুন নানী দূরে ঠেলে দেয় আমাদের। আমরা হয়ে যাই একা। আর আমাদের জীবনে শুরু হওয়া সেই একাকীত্ব, সেই দু:খ ঘুচেছে কেবল তোদের হাসিমুখ দেখেই; তোরাই তো আমাকে বাঁচিয়েছিস রে, তোরাই আমাকে জন্ম দিয়েছিস।”

এই উদ্দামতা, এই স্বাধীনতা, এই স্নেহ-নিবীড়তার মাঝে বড় হতে পেরেছি বলেই, নিজেদের হতদরিদ্র বলাটায় আক্ষেপের স্পর্শ নেই। আর যার চোখে- গ্রামের সেই মেঠোপথে পা দুটোকে ধূসর করার ছবি, সবুজ ঘাসের বুকে বিকেলের রোদের ঝিলিক কিংবা সকালের কুয়াশার রংধনুর স্মৃতি ভাসে, যার নাকে এখনো সরিষা-ফুলের মৌতাত, শুকনো খড়ের মেটোগন্ধ ভাসে, যারা অনুভূতিতে এখনো লেগে আছে দীঘির পাড়ের পুরোনো অশ্বত্থের বুড়ো চামড়াটার স্নেহস্পর্শ- সে কি সম্পদের অভাব বলে চেঁচাতে পারে! আমি তো এখনো চোখ বুঁজে, মনকে নিয়ে চলে যাই- পঙ্গপালের মতো এক দঙ্গল উল্লাসে – চাচাতো, মামাতো, ফুফাতো, পাড়াত ভাই বোনদের সাথে খেলতে খেলতে ঝগড়া, ঝগড়া করতে করতে খেলা। এখন ভাবি, পৃথিবীটা তখন কত অন্য রকম ছিলো! তখন জানতাম শত্রুতা হচ্ছে খেলা, এরা আসলে মিত্রই, শুধু ভান ধরে বসে আছে। আর এখন জানি, মিত্র আসলে শত্রুই, যে কোন সময় প্রাণ হরণের জন্য বসে আছে। বড় হতেই বিচ্ছিরি সব চিন্তাভাবনা ভর করে, এরকম কথায় কথায় হা-হুতাশ চলে আসে কিন্তু স্বপ্ন দেখার অভ্যাসটা হয়তো রয়ে গেছে এখনো মনের ভেতর। সেই অভাবের মধ্যে প্রতিনিয়ত এই স্বপ্নই যে ছিলো বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা, সবসময়ের সাথী, প্রতি রাত্রের অভ্যাস। ভালোর স্বপ্ন দেখতাম, কিন্তু ভালোটা যে কি তা একেক সময় একেক রকম মনে হয়েছে। কখনো মনে হয়েছে- সুপারম্যান ভালো। তারপর মনে হয়েছে- নাহ, এরা সব ফালতু। তিন গোয়েন্দার চেয়ে ভালো কেউ আছে নাকি! পরে মনে হয়েছে, আরে ধুর! সব ভালো তো টম স্যয়ার। পরে আরো অনেক ভালো এসেছে- কখনো শাহরুখ খান, কখনো দীপিকা, কখনো বিল গেটস, কখনো স্টিভ জভস। এভাবেই ভালোকে খুঁজে যাচ্ছিলাম- চিন্তায়, স্বপ্নে, মনের তাগাদায়।

বাবা ঢাকায় থাকতেন- টাকা পয়সা কিছু পাঠাতেন, আবার কখনও পাঠাতে পারতেনও না। তার এই বেকায়দা খেয়াল- আমাদেরকেও বেহাল করে রেখেছিলো। মা চেয়ারম্যানের বাড়িতে কাজ করে পেতেন দু’বেলার খাবার, আর সামান্য কিছু টাকা। যা দিয়ে আমরা তিনজন, তিনপেয়ে চেয়ারের মতো করে চলছিলাম। বহুদিন সকালে খাবার খেয়েছি, আর দুপুরে, রাতে খাবারের স্বপ্ন দেখতে দেখতে, আর পেটের ভেতরে কি হয় সেই বিস্ময়টাকে ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছি। অনেকদিন দুর্বল শরীরে, ঘুমের ঘোরে টের পেতাম, বড় বোন আর মা পাশে বসে অশ্রুপাত করছে। এখনো মাঝে মাঝে সেই বিষাদ-মলিন মুখের দু:স্বপ্ন দেখে জেগে উঠি। মনে পড়ে, বহুদিন ঘুম থেকে উঠে যখন মায়ের আঁচলটা ধরতে চাইতাম। শুনতাম- সকালে উঠেই চেয়ারম্যানের বাড়িতে গেছে, কাজে। হৃদয় মুচড়ে উঠতো, চোখের তারা ঝাপসা হয়ে যেতো। তারপরেই ভেসে আসতো, আরেকটা স্নেহের সুর- বড় বোন বুকে টেনে নিয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছে, বলছে, “চিন্তা করিস না। মা এসে পরবে। আর আমরা ঢাকায় যাব। আব্বার কাছে, ওখানে গেলে আমাদের আর এমন দিন দেখতে হবে না। সব ঠিক হয়ে যাবে।” মাঝে মাঝে ভাবি মানুষের কষ্ট আর আনন্দের সীমানাটা কোথায়! সুখ আর দু:খ এত নিবিড় কেন!

কিন্তু বড় আপাদের সান্তনাটা এই বাস্তব জগতে নিছক সান্তনাই থাকে। কেন বলছি এ কথা? আমাদের দুর্দশা দেখে, গ্রামের মুরব্বিরা ঠিক করলেন- তারা চাঁদা তুলে, আমাদের কিছু টাকা দিয়ে ঢাকায় পাঠাবেন, আমার বাবার কাছে। কিন্তু আমরা ঠিকঠাক জানতামই না- বাবা কোথায় থাকে। ভাসাভাসা শুনেছিলাম- মিরপুর ১১ নম্বরে, কালশী বলে কোথাও এক জায়গায় থাকে। তবে এটা জানা ছিলো, সে যে মেসে থাকে, তার মালিক আমাদের জেলার বাসিন্দা। আর সেই ঠিকানার উপরেই ভরসা করে ঢাকায় আসলাম জীবনে প্রথমবার। সে সময় আমায় বয়স বোধহয় ৫/৬ বছর হবে, আর আমার বড় বোনের বয়স ১০/১১। তাকে খুজেঁ বের করাটা একটা এ্যাডভেঞ্চারই ছিলো বলা যায়। প্রায় দীর্ঘ তিন বছর পর, আমাদের মহান পিতার সাথে দেখা। রুমে বসে ছিলেন তিনি, একা। আমাদের দেখে চমকে উঠলেন। হয়তো অবাক হয়ে ভাবলেন, এরা কিভাবে এখানে এলো? তবে তিনি আমাদের চিনতে সক্ষম হলেন, এটা আমাদের পরম সৌভাগ্যই বলতে হবে। তিন বছরে ছোটদের চেহারা খুব দ্রুত পাল্টায় কিনা। মানুষ হুমড়ে পড়লো আমাদের দেখতে। কি ভীষণ হৈ-চৈ। আমরা বিস্মিত। মানুষ আমাদের এত গুরুত্ব দেয়! কই, না খেয়ে মরার সময় তো কাউকে এমন করে আমাদের দিকে তাকাতে দেখিনি! তখন তো আমরা বাতাস ছিলাম- আছি কিন্তু নেই, আর আজ কেমন রাতারাতি কিছু একটা হয়ে গেছি। পৃথিবীতে বোধহয় বিস্ময়ের শেষ নেই। তখনও বিস্মিত হয়েছিলাম। সেই বয়সে মনে হয়েছিলো- এই উল্টো আচরণটা ভীষণই অযৌক্তিক, ভীষণরকম অস্বাভাবিক।

যাই হোক, সে দিন আমরা মেসের এক রুমেই থাকলাম আর সারারাত ধরে, সে মেসের মালিক আমার মায়ের দুর্দশার ইতিহাস শুনলেন। পরের দিনটা ছিলো আরেকটা বিস্ময়। সকালে আমাদের সেই মেস মালিক আমাদের একটি রুম নিয়ে দেয়, আর কিছু মালপত্র কিনে দেন, আর আমাকে বলেন, “তুই আমাকে মামা বলবি, আমি তোর মামার মতো। আর হ্যাঁ যে কোনো কিছু প্রয়োজন হলে আমাকে বলিস, আমি তোকে কিনে দিব।” স্নেহের সেই কয়টি কথা এখনো কানে বাজে। এখনো অনুভব করি, সামান্য এই কয়টা কথা কতটা অনুপ্রেরণা আর প্রত্যাশা জাগাতে পারে। ডুবে যাওয়া মানুষদের খরকুটোর মূল্যটা যে কত তা যারা শুধু প্রবাদটা শুনেছে তারা কোনদিনই কি বুঝতে পারবে? তবে “বিধি-বাম” বলেও একটা বাগধারা আছে, সেটা বোধহয় তার মর্ম সবাইকেই মাঝে মাঝে হাড়ে হাড়ে টের পাইয়ে দেয়। কিছুদিন পরেই মা ও আমি একসাথে অসুস্থ হলাম। মহামুশকিলে পরলেন আমার বাবা- চিকিৎসা করাতে যে টাকা লাগে। পরে সিদ্ধান্ত নিলেন বাবা আমাদের আবার বাড়িতে পাঠাবে। কিন্তু তখন মায়ের রুদ্ররূপটাও দেখলাম। মা সাফ জানিয়ে দিলেন, “মরলে এখানেই মরব, তবু বাড়ি যাব না”। মামার কানে কোনভাবে গিয়েছিলো সে খবর। তিনি কিছু টাকা দিয়ে আমাদের চিকিৎসা করাতে বললেন, আর আমার বাবাকে বলে দিলেন, “ওরা এখানেই থাক, সমস্যা কি? তুমি ভালোমতো কাজকর্ম কর।” কিন্তু বিধির বোধহয় বাম দিকটা একটু বেশিই পছন্দ। কিছু দিন যেতে না যেতেই আবার সেই অভাব। বাধ্য হয়ে, মা বড় বোনকে একটা কারখানায় কাজে পাঠালেন। দিন যেতে লাগলো। দুই তিন বছর পরে বড় বোন বেশি বেতনের আশায় অন্য এক গার্মেন্টসে ঢুকলেন। কারণ খরচ তখন অনেক বেড়েছে । আমি একটা পান দোকানে কাজ নিলাম। এরই সাথে স্কুলেও পড়তাম। যদিও ক্লাস করতে পারতাম না প্রতিদিন।

জগৎ সংসারকে শিখতে থাকলাম। এটা ছিলো আরেকটা জীবন। এখানে মাঠ নেই, রোদ্দুর নেই, নিরবতা নেই। হঠাৎ একদিন দেখতে পেলাম আপুর হাতে ফোন। আপুকে জিজ্ঞাস করলাম,“আপু তুমি কি ফোন কিনেছো?” আপু বললো,“না রে”। “তা হলে ফোন কোথায় পেয়েছো তুমি?” আবার জিজ্ঞেস করলাম। আপু ফিসফিস করে উত্তর দিলো,“আমার কাছে ফোন আছে এটা তুই মাকে বলবি না, নইলে তোকে আর কিছু কিনে দিব না”। আমি বললাম, “আচ্ছা, বলবো না ঠিক আছে- কিন্তু বললে না তো কে দিয়েছে?” আপু একটু হেসে বললো, “পরে বলব”। কিন্তু আপুর বা আমার- কারোরই আর পরে বলা হয়নি। শত দু:খকষ্টে পোড়খাওয়া মা-ই জেনে ফেলেছেন, তার ফোনের খবর। আর তার সূত্রধরে যা বেরিয়ে এলো সেটা দু:সংবাদ না সুসংবাদ তা বিচার করার মতো বোধ তখনও যে আমার হয়নি। জানলাম, আপু বিয়ে করেছেন- মাদারীপুরের এক ছেলেকে। একই গার্মেন্টসে সে আপুর সাথে কাজ করে।

আমি জানি এটা ছিলো আমাদের পরিবারের নাগরিক পরিবর্তন। নক্ষত্রের মাঝে সৌরকলঙ্কের খেলা। এ নিয়ে অনেক কিছু হয়ে গেলে আমাদের সংসারে। কি ভীষণ ওলট পালট! কি তরঙ্গ! কিন্তু দেখলাম, সব ঝড়েরই সমাপ্তি থাকে। সবকিছুই শেষ হয়। পরে যেন সব উত্তেজনা শান্ত হয়ে এলো। এক ফাকেঁ, দুলাভাই বোনকে নিতে বাসায় এলেন। পরিবারে এই প্রথম একজন নতুনের আগমন। কিন্তু সব নতুনই পুরাতন অনেক কিছুকে বদলে দেয়। আপুকে নিয়ে যাবার পরে- আবার সেই পতন, আবার দারিদ্র, কষ্ট। কাজেই, সংসারের বোঝা কাঁধে তোলার ডাক এবার এসে গেলো।

পৃথিবীর সত্যিকারের সংগ্রামে যোগ দেবার ডাকে- চাকরি নিলাম একটা কারখানায়। মনটা আনন্দিত। বড় হয়েছি বোধহয়। কি রকম একটা সুখ সুখ অনুভূতি ছিলো এটার! কিন্তু সুখ আর দু:খের ছন্দেই যে জীবন! দু:খ দেখতে দেখতে এটাকে এখন আর ছন্দপতন বলে মনে হয় না, মনে হয় ছন্দের বুনন। কিছুদিন কাজ করতেই হাতে বিশ্রী ঘাঁ হলো- আর মালিক আমাকে দিল তাড়িয়ে। কিন্তু ব্যাটায় জীবন থেকে তো তাড়াতে পারেনি। কাজেই, হাতের ঘাঁ শুকালে আমি আবার অন্য এক কারখানায় কাজ নিলাম। আর এখানে এসে দেখলাম নিয়তির সেই খেলা করার আদ্যিকালের অভ্যাসটাকে। দেখতে থাকলাম, সবকিছুকে যেমন দেখা যায় তেমন নয়। এমন একজন মানুষকে দেখলাম- যিনি দেখতে আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতোই কিন্তু আমার কাছে তিনি অন্যরকম। আমার হৃদয়ের ছবিতে তার পেছনে একটা আলোকবর্তিকা থাকে- আর সেটা তিনি অর্জন করেছেন তার চেতনা, তার মহত্ত্ব ও ভালোবাসার জোরে। আমি তাকে কাকা বলে ডাকতাম। অল্প দিনেই তিনি আমার মধ্যে একটা অসহায় আমিকে খুজেঁ পেলেন। তিনি আমাকে খুব কাছে টেনে নিয়ে, মাকে জানালেন, “আমি আজিমুলকে আমার ভাইপো মনে করে কাজ শেখাব, আর দেখে শুনে রাখব। আপনি কোনো চিন্তা করবেন না।” শুরু হলো আমার ভিন্ন এক পদযাত্রা, যে যাত্রায় আমি ভুলে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম নিজেকে। সমস্ত কিছু পরে, আবার জেগে উঠলো সেই ভালোর স্বপ্ন। বড় হবার স্বপ্ন। আর বড় হতেও থাকলাম- অন্তত শরীর-গতরে। কাকা একদিন আমাকে মেশিনে বসিয়ে দিলেন। একমাসে জীবনে প্রথম ৬০০০/৭০০০ টাকা উপার্জন করতে পারলাম। সবাইকে বিস্মিত করে, নিজেই বিস্মিত হলাম। অভিজ্ঞ কারিগররাও শুনে বড় বড় চোখ করে যেভাবে বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন- তাতে মনে হচ্ছিলো আমি গোল্ড মেডেল পেয়েছি। কিন্তু আমার শরীর, আমার ক্ষয়ে থাকা মন জানতো, এই বেশি উপার্জনের কারণ ছিল, আমার মাসে ২০টা নাইট। সেই বড় হবার, সেই স্বপ্ন পূরণের আকুল আকাঙ্ক্ষায় ঘুমকেই যে বিদায় করেছিলাম। আমার রোজগার বাড়লো, আমিও বড় হতে থাকলাম। কিন্তু বড় কি আদৌ হতে পারছিলাম। দারিদ্র আর অভাবের সাথে পাল্লায় কি জয় হওয়া যায়! আমি কি পূর্ণ হচ্ছিলাম, নাকি নি:শেষ হচ্ছিলাম! কেন মনে হতো- আমার স্বপ্ন যেন হারিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারের অন্তরালে।

এবার এলাম সেই বিখ্যাত ধনতান্ত্রিক সিদ্ধান্তে- অল্প অল্প করে কিছু টাকা জমাব। সাথে কিছু নীতিমালাও তৈরি করেছিলাম মনে আছে- শুধু পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়বো, অপ্রয়োজনে কোনো কথা বলব না, কারো সাথে খারাপ ব্যবহার করব না। পূঁজিবাদের সাথে ধর্ম না মেশালে সেটা জমবে কেন? এবারের স্বপ্ন হলো- আমি হবো বিত্তশালী ধার্মিক। কিন্তু তখনও তো চোখ বুঁজে নেই। আমার অতীত আমাকে জানাতো- এখানে ভালো মানুষের কোনো মূল্য নেই। সবচেয়ে ভালো মানুষটাকেও যে মার খেতে দেখেছি, খারাপের বাহুর জোরের কাছে? ভাবতাম, এটাই কি বড় হওয়া! এটাই কি সেই ভালোর স্বপ্ন! অন্যকে মেরে নিজের পেশী ফোলানো? বার বার পিছলে যাচ্ছিলাম- সন্দেহে, দ্বিধায়, প্রশ্নে। এবার ভালো হওয়া, বড় হওয়ার মানেটাকেই হারিয়ে ফেলছিলাম। অন্ধকার- নি:সীম অন্ধকারই শুধু ছিলো তখনকার রাতের কল্পনায়। কোন আশা নেই। শুধু ভয়, মৃত্যু, আশঙ্কা, সন্দেহ. পদস্খলন, অবক্ষয়। এই সমাজে যে এগুলোরই বাহাদুরি! আমি কি বড় হতে পারবো না? আমি কি ভালো হতে পারবো না?

উত্তরটা মিললো একটা অভাবনীয় ঘটনায়। কারখানায় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায়, কাকা আমার পাশের এক কর্মচারী ভাইয়ের কাছে একটি বিশেষ বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিলেন। আমি আগেও শুনেছি তিনি কি যেন আন্দোলন করেন। বুঝতে পারলাম, সে বিষয় নিয়েই কথা হচ্ছিল। আমি বহুবার দেখেছি- তাঁদের ওভাবে কথা বলা। কিন্তু কখনো খেয়াল করিনি বা শোনার প্রয়োজন বোধ করিনি। সে দিন কেন জানি শুনতে খুব ইচ্ছে হলো। কাকার কাছে গেলাম তার কথাগুলো শুনতে। কিন্তু বিধি সেদিন আবার বামদিকের সিংহাসনে। তখনই বিদ্যুৎ চলে আসায়, সবাই যে যার কাজে ফিরে গেলো। আমিও চলে গেলাম অল্প কয়েকটা কথা শোনার পর। তবে আলোর বীজ যে আলোই ছড়ায়। মনের অন্ধকারে যেন একটা রশ্মি দেখতে পেলাম। কিন্তু দুই একদিন পরেই দেখলাম, কাকার আন্দোলনের একজন ভাইকে মার্কেটের কিছু মানুষ ধরে মারধর করছে। তিনি এই মার্কেটে ব্যবসার জন্য গেঞ্জি নিতে আসতেন। তখন কাকাসহ আরো কয়েকজন ওঁনাকে উদ্ধার করেন, ও নিয়ে বাসায় যান। আমি ব্যথিত মন নিয়ে একফাকেঁ তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম,“কাকা যে আন্দোলন করে, তার নাম কি বা তাঁরা কি কাজ করেন?”
.
শুনলাম, এ আন্দোলন হচ্ছে ‘হেযবুত তওহীদ’। আমার প্রশ্নের উত্তরে, তিনি আমাকে ‘ইসলামের প্রকৃত রূপ-রেখা’ ও ‘ইসলামের প্রকৃত সালাহ’ বইদুটি পড়তে বলেন। জানালাম, দীর্ঘদিন পড়াশোনা থেকে দূরে থাকায়, তখন আমি তেমন পড়তে পারি না। এমনকি নিজের নামটাও লিখতে পারতাম। পরে তিনি আমাকে কিছু পৃষ্ঠা পড়ে শোনালেন। আমি চমকে উঠলাম। আমি মন্দটা ছোট বেলা থেকেই দেখেছি, এই প্রথম ভালোটা শুনলাম। আমি আমার স্বপ্নকে দেখতে পেলাম। আমি দেখতে পেলাম মানুষের সত্যিকারের বড় হবার রাস্তা। এই প্রথম জানলাম- বিনিময় ছাড়াই মানুষ কাজ করে মানুষের জন্য, মানুষের কল্যাণের জন্য, মানুষের মুক্তির জন্য। পরের দিন শুনলাম, কাকা আসলেন আর সেই সহকর্মীকে বলছেন, “আমরা এ দেশের আইন মেনে চলি, আমরা মানুষের কল্যাণে আমাদের জীবন সম্পদ উৎসর্গ করেছি। আমরা অকারণে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে কারো গায়ে হাত দিতে পারি না, তাই তারা বারবার আমাদের ভাইদের উপর এভাবে হামলা করে রক্তাত্ব করে। যার শাস্তি দেয়ার জন্য আল্লাহই যথেষ্ঠ।” আমি শুধু কাকার কথাগুলো চুপ করে শুনছিলাম। বিস্মিত হচ্ছিলাম, এই কথাগুলো তো মানুষ বলে না। সবাই তো তার আয়ের কথা বলে, ভবিষ্যতের কথা বলে, নিজেকে বড় করার কথা বলে। কিন্তু তিনি যে পৃথিবীর সবাইকে বড় করতে গিয়ে, নিজেই বড় হয়ে গেছেন। তাকে যে কেউ ডিঙ্গোতেই পারবে না! তিনি আরও বললেন- দাজ্জালের বিষয়ে। জীবনে প্রথমবার দাজ্জাল নামটা শুনলাম আর ভীষণভাবে অবাক হলাম। তিনি যখন দাজ্জালের বর্ণনা দিচ্ছিলেন তখন আমি তাঁর কথায় হারিয়ে গিয়েছিলাম। কিছুক্ষণের জন্য বোধ ছিল না আমার, আমি যেন তাঁর দাজ্জাল সম্পর্কিত প্রত্যেকটি কথা চাক্ষুষ দেখছিলাম। কাকা জানালেন, এ বিষয় সম্পর্কিত একটি ভিডিও ডকুমেন্টরিও নির্মিত হয়েছে।

দুপুর গড়িয়ে এলো। আমি কাকাকে বললাম, “আমি আজ আপনার বাসায় যাব”। কাকা বললেন,“চল, সমস্যা কি”। আমি যেতে যেতে কাকাকে বললাম যে, “কাকা আপনি কত দিন হয়েছে এই হেযবুত তওহীদ আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন?” কাকা বললেন, “এই হবে দেড়-দুই বছর”। আমি বললাম,“ও, ভালো। আচ্ছা কাকা, এই ডকুমেন্টারিটা কি আপনার বাসায় আছে?” কাকা বললেন,“আছে।” আমি তো খুশিতে আত্মহারা। আমি বোধহয় আমার স্বপ্নের সিঁড়ির দেখা পেয়েছি। বাসায় গিয়ে আমি পৃথিবীর সব কিছু ভুলে গিয়ে শুধু ডকুমেন্টরিটা দেখলাম। অল্প সময়ই যেন শেষ হয়ে গেল ডকুমেন্টরিটা, আমার মন ভরলো না সিডিটি দেখে। কম্পিউটারের দোকানে গিয়ে ডকুমেন্টরিটা ফোনে ভরলাম। কারখানায় এসে, টানা দুই দিন দিনরাত লাগিয়ে আমি দাজ্জাল ডকুমেন্টরিটি দেখলাম। যতবারই আমি দেখেছি ততবারই যেন নতুন কিছু পেয়েছি। আমি বুঝতে শুরু করলাম- বর্তমান সমাজের অন্তসারশূন্যতা। এই সমাজের আত্মকেন্দ্রিতার ধরণ ও কারণ। আমি জানলাম, বড় হবার যে রাস্তা এই সমাজ তৈরি করেছে, সেটা একটা চাকচিক্যময় প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়। মানুষকে তা স্বস্থি দেয় না, শান্তি দেয় না, অবসর দেয় না। শুধু এভাবে ছুটে চলা, লোভ, প্রত্যাশা, আকাঙ্ক্ষা, আর অহমিকার জালে বন্দী করে রাখে। জানলাম, রাসুল বর্ণিত সেই দাজ্জাল এখন বিরাজমান। ত্রাসসৃষ্টিকারী সেই শক্তির পদানত হয়ে আছে পুরো পৃথিবী। আর একারণেই জীবনভর আমার আর আমার মতো মানুষের এত দুর্দশা, এত কষ্ট, এত অশ্রু। আর তা নিয়েই উল্লাস এই দাজ্জালের, তা নিয়েই এত বাহাদুরি তার। আমি ব্যকুল হয়ে উঠলাম। সত্যের পথ, পৃথিবীর মুক্তির আন্দোলন হেযবুত তওহীদে যোগ দেওয়ার জন্য আমার হৃদয় উন্মুক্ত হয়ে গেল। আজি বুঝতে পারলাম, আমার স্বপ্ন, আমার আকাঙ্ক্ষার সত্যিকারের রূপ এই হেযবুত তওহীদের মাঝেই গচ্ছিত। আমি যে পথে, যে সমাজে দাঁড়িয়ে সেটা আল্লাহর প্রেরিত নবী-রসুলগণের মাধ্যমে সত্য ধর্ম-অনুযায়ী চলা মানুষের সমাজ নয়। এখানে যে যত বড়, সে তত বিচ্যুত। আমরা এখন দাজ্জালের যুগে এসে দাঁড়িয়েছি অথচ মানুষ এখনো অচেতন।

আমি এখন সেই আল্লাহর দলে, বড়দের দলে। আমার স্বপ্ন সত্য হয়েছে। আমি খুঁজে পেয়েছি সত্যিকারের ভালোকে। আল্লাহর অশেষ কৃপায়, ২০১২ সালের প্রথম মাসে আমি হেযবুত তওহীদে যুক্ত হই। জীবনের সমস্ত পাপ সত্যের পরশে মুছে পরিশুদ্ধতা লাভ করলাম, পেলাম মুক্তির পথ।

চক্ষুগোচর

 
আমি শৈশব থেকে দেখে এসেছি, সমাজের বৈরিতা বৈষম্য বিদ্বেষ অনৈতিক কার্যকলাপ। মানুষের মধ্যে দেখেছি মানুষের জন্য যতটুকু সম্মান, তার থেকে অধিক মানুষের জন্য ক্ষতি করার “হীন” চিন্তা ভাবনা। আমি তো এমনো দেখেছি, “সন্তানের হাতে মাতা-পিতা খুন, ভাইয়ের দৃষ্টি আপন বোনকে করেছে গুম”। এর থেকেও নেক্কারজনক ঘটনা হচ্ছে, যে ধর্মবিদ্যালয়ে (মাদ্রাসা) আমরা ধর্মের জ্ঞান লাভ করি, সে বিদ্যালয়ে পর্যন্ত ধর্ষিত হয়েছে-হচ্ছে কোমলমতী মেয়েরা। যে শিক্ষকগণের জন্য সম্মান ছিল আকাশের ন্যায় অসীম আজ সেই শিক্ষকগণকে রাস্তা-ঘাটে ধরে ধরে মারছে ছাত্ররা। এ দৃশ্য শুধু আমি নয় আপনারাও দেখেছেন।

আমি অতিসাধারণ একজন ছেলে (মানুষ) আমি আপনাদের কারো ভুল ধরতে বসিনি, না আপনাদের নিচু দেখাতে বসেছি। আমি শুধু একটি কথা স্মরণ করিয়ে দিতে এসেছি আপনাদের। আমরা মানুষ, এই সুন্দর সৃষ্টির সেরা সৃষ্টি, শ্রেষ্ট জীব। আর পাঁচটা সৃষ্টির মতো নই আমরা, নই কোনো আত্মাহীন পশু। আমাদের এই তাজ্জব দেহে অদৃশ্য এক রূহু রয়েছে, যে রূহুটাই আসলে আমি বা আমরা। আর আমাদের এই দেহ হচ্ছে, আমি রূহুর পোশাক বা বাহন। “আমাদের এই পৃথিবীতে আমাদেরকে পাঠানোর যে উদ্দেশ্য” “সে উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ করতে আমরা শুধু এই মাটির তৈরি দেহের সাহায্য নিয়েছি”। এই দেহের সেবক হিসাবে আমাদের সৃষ্টি করা হয়নি, আমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে সৃষ্টির সেবক হিসেবে। আমাদের এই পৃথিবীতে কিছু নির্দিষ্ট দায়িত্ব রয়েছে, যা আমাদের সম্পূর্ণ করে যেতে হবে।

সেই দায়িত্বটা কি? তা আমরা আজ ভুলে গেছি, ভুলে গেছি মানুষের ধর্ম মানবতা, ভুলে গেছি মানুষের জন্যই ধর্ম-ধর্মের জন্য মানুষকে সৃষ্টি করা হয়নি। আজ আমাদের এই বিষয়গুলো অজানায় থাকার কারণে; আমরা, নিরলসভাবে জীবনযাপন করছি, যে যার মতো করে। আর সমাজে দিন-দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে অন্যায় অত্যাচার অবিচার সহিংসতা।

“আমি অরাজনৈতিক আন্দোলন হেযবুত তওহীদ ৭ বছর ধরে, করে আসছি"। “এবং হেযবুত তওহীদে যে আল্লাহ প্রদত্ত শিক্ষা, তা নিঃস্বার্থভাবে মানুষকে জানিয়ে যাচ্ছি গত ৭ বছর ধরে”। আমি যখন শুধু সমাজের একজন মানুষ ছিলাম, তখন আমার শুধু চিন্তা-ভাবনা ছিল, নিজেকে ভালো রাখা। কিন্তু এক সময় এসে আমি বুঝতে সক্ষম হলাম যে। যে সময়- সমাজে অন্যায়ের দাবানল জ্বলে, তখন সে সমাজের কোনো ব্যক্তি এককভাবে শান্তিতে থাকতে পারে না ( আমিও পারিনি)। এটা হয়তো অনেকে বলতে পারবেন যে, আপনারা ভালো খাচ্ছেন, ভালো পড়ছেন। কিন্তু ভালো খাওয়া বা ভালো জামা পরিধানকে শান্তি বলে না।

শান্তি এমন এক পরিবেশের নাম, যেখানে কোনো অন্যায় নেই, যেখানে কোনো অবিচার নেই, যেখানে কোনো নারীর ইজ্জত হারানোর ভয় নেই। যেখানে মানুষ নিরাপদে পথ চলতে পারে, যেখানে কেউ অনৈতিক কাজ করলে তা সবাই নির্ভয়ে প্রতিবাদ করতে পারে, সেই পরিবেশটির নামই ন্যায়পূর্ণ সমাজ শান্তিপূর্ণ সমাজ।

ঘাস যেভাবে শিশিরবিন্দু ছাড়া মৃত্যুশয্যায় ঝুঁকে পরে, ঠিক তেমনভাবে মানুষ, মানুষের সম্প্রীতি একতা ন্যায়পরায়ণতা শূন্যতায় “মৃত হয়ে যায়”। আজ সমাজের চতুর্দিকে একমুঠো শান্তির হাহাকার আর আকাশে বাতাসে বণিতার আর্তনাদ।

এমন অবস্থায় মুক্তির একটাই পথ, আসুন আমরা আল্লাহর সেই পবিত্র বিধান আমাদের জীবনে, জীবনব্যবস্থা হিসেবে মেনে নেই, এবং সকল প্রকার অনৈক্য মতভেদ ছুঁড়ে ফেলে ঐক্যবদ্ধ হই। সকল ধর্মের সকল বর্ণের অনুসারীরা আমরা একটা সিদ্ধান্তের উপর দাঁড়াই যে, আমরা সবাই এক স্রষ্টার সৃষ্টি এক পিতা-মাতা-আদম-হাওয়ার সন্তান, আমরা সবাই এক পরিবার। তাই কেউ আর কারো প্রতি অন্যায় করব না কারো প্রতি জুলুম করব না, সবাই সম্মিলিতভাবে মিলেমিশে বসবাস করব।

Wednesday, 23 January 2019

অনুক্ষণে

 
ভালো লাগে তোমার হাসি
খুব যে আমি ভালোবাসি।
দূর গগনে তোমার উঠোনে
মেঘের ভেলায় আমি ভাসি।
.
মিষ্টি রোদ্দুর তুমিবিনা শূন্য দুপুর
বেদনা-বিধুর আমার গানের সুর।
কোলাহল নেই পাখিদের কলতান
হৃদয়ে জমেছে ব্যাথা অভিমান।
.
তোমার পদচরণ কত স্থানে দেখি
আমায় কেন দূরে রাখলে সখী?
আমি তো তোমায় দেবী করেছিনু
আমার মনের মন্দিরে
তবে কেন পরদেশী করলে আমায়?

কথোপকথন -১

আমি: তুমি কি জানো প্রিয়া, সূর্যের রঙ কত প্রকার হয়?
তামান্না: আমি জানি না প্রিয়, তুমি বলেই হয়.....
আমি বলব? হ্যাঁ তুমিই বলো-
সূর্যের রঙ দেখেছি আমি সেদিন ছিল লাল,
হঠাৎ দেখেছিনু কমলে গতকাল,
ধূপ বর্ণও হয় যে প্রিয়া মাঝে মধ্যে দেখি।
তামান্না: এসব তুমি বলছ কি?
আমি: সত্যি বলছি প্রিয়সী।
.
তামান্না: আচ্ছা নদীরজলে কোনো কালে, দেখেছ কি তুমি?
আমি: কি?
তামান্না: সূর্যের আলোয় শাপলা খেলা করে,
নীলজলে স্নেহের ছলে, শাপলা যে দোলে।
দেখেছ কি পদ্মপাতায় জলরাশি
দেখেছ কি কচুরিপানায় জল থাকতে নিরাপদ?
আমি: না তো, দেখিনি তো কখনো প্রিয়া...
তামান্না: কি বল তুমি... এসব দৃশ্য না দেখে থাকলে কী করে,
হবে তুমি আমার কাছে দামী?
আমি: আমি দামী হতে চাইনে তোমার কাছে প্রিয়া,
চাই শুধু একটু কাছে পেতে তোমার হিয়া।
যেথায় তুমি সযত্নে রাখো পবিত্র স্বপ্ন-শিশু,
সেথায় আমি হতে চাই শুধু অল্প কিছু।
তামান্না: ও আচ্ছা এই তোমার বাসনা...
আমি: হুম প্রিয়া এইটুকুই আমার বাসনা...
যদি পূর্ণ করতে ইচ্ছুক থাকো তুমি,
তবে এবার একটু হাসনা।
.
তামান্না: অকারণে কী হাসা যায় প্রিয়, তুমি একটু কারণ বল,
আমি হেসে দিই-তুমিও হেসে দিও।
আর হ্যাঁ আমার হাসিতে কি তুমি
ভীষণ আনন্দ অনুভব করো?
আমি: আনন্দ বললেও কম হবে প্রিয়া,
তোমার হাসিতে আমি পারি ভাসিতে,
শূন্য জমিতে কৃষক যেভাবে করে চাষ,
আমি তোমার অল্প হাসিতে বেঁচে থাকার উৎস পাই,
লক্ষ্য কোটি বছর, অগণিত মাস।
.
তামান্না: তাই বুঝি,
আমি: হুম....তোমার কোনো সন্দেহ আছে কী এতে?
তামান্না: না, সন্দেহ না; তবে কেন জানি আমি মানি,
এসব ভালো লাগা, মনোহর সুখ, বেশি হলে,
বেদনা-বিধুর হয় বুক-খুব।
তাই ভয় পেয়ে যাই, শূন্যতায় মুখ লুকাই,
তোমার কথা স্মরণ হলে,
আঁধারে আমি নিজেকে শুঁকাই।
.
আমি: আমি জানি-রাণী, তুমি কেন এমন ভেবেছ,
দ্বন্দ্বটা তো তোমার মনের নয়।
এমন দ্বন্দ্বটা তো সূচনা করেছে কিছু প্রবঞ্চক মানুষ,
যারা মনুষ্যত্ব বিকিয়ে দিয়ে, করেছে অপকর্ম,
তাদের জন্য আজ কুৎসিত ধর্ম-মর্ম- সাম্য।
আমার কথায় জানি... আমি, হবে না কিছুই ঠিক।
তবু তারা যতই সমাজ থেকে মানুষের মন থেকে ভালোবাসা ছিনে নিক। যে’সব মানুষ ভালো কাজে সবার মাঝে অবিচল,
তাঁদের মনে হয়তো কোনো ক্ষণে আমি হবো ভিত।
সেদিন না হয় বলিও তুমি, আমি তোমার স্বপ্ন-পুরুষ.....
হাজারো শূন্যতায় মগ্ন ছিলে যে রাজকুমারের জন্য।
হয়তো সেদিন হবো আমি... তোমার পেয়ে ধন্য।
আজ না হয় তোমার কল্যাণে হই আমি ভিন্ন।

Saturday, 19 January 2019

বিদায়

এক খাটে আমার দেহ
তার পাশে আমি দাঁড়িয়ে,
তোমরা সবাই ব্যস্ত কাজে
আমি যাচ্ছি নিরুদ্দেশ হারিয়ে।
এক্ষুনি তোমরা শুনতে পাবে
উড়ন্ত চিল আমাকে খাবে,
আত্মা আমার ওপারে যাবে
ভূমিতে শুধু দেহ শোয়াবে।
.
স্মৃতি স্মরণে হয়তো কাঁদবে তুমিরা
আমার ভূমি থেকে দূরে,
পরম আপন হবে আমার ক্ষুদ্রস্থান
হয়তো শুনতে পাব সুরে।
বেঁচে থাকতে তুমি দেওনি সারা
সদাই বলেছো আছে তাড়া,
আমি ছিলাম শুধু স্বজন হারা
ভালো থেকো আমি ছাড়া।
.
কখনো যদি দুঃখ দিয়ে থাকি
বিদায় ক্ষণে ক্ষমা রাখি,
ক্ষমা করিও আমায় চিরতরে
আমি যাচ্ছি আজ বন্ধঘরে।
নীল আকাশে নীলিমা উঠেনি
মৃত্যুর পূর্বে দেখেছি,
তবু হৃদয়ে তোমাদের আমি
রংতুলি দিয়ে এঁকেছি।

গদ্য

আমার মনে বেদনার ঝর
তোমাদের মনে সুখ
আমার সারা শরীরজুড়ে
হয়েছে শীর্ণ অসুখ।
.
তোমাদের আমি দোষ দিইনা
মহাদোষী তো আমি,
তোমরা কতটা ভালো মানুষ
জানে আমার অন্তর্যামী।
.
মুখের কথায় ছুঁড়ো অনির্বান
ব্যবহারে দেও পরিচয়,
আমি বোকা ছেলে শুধু শুধু
সময় করেছি অপচয়।
.
ঈশ্বর গ্রন্থে স্পষ্ট লেখা
তোমরা যে ভীষণ অবাধ্য
আমার কথা পদ্য নয় যে
আমার কথা গদ্য।

Wednesday, 16 January 2019

বলো?

আমি তোমার সেই আয়না হতে চাই
আমি তোমার সব বায়না হতে চাই
আমি তোমার কপালে রোজ সকালে
টিপ হয়ে- সুন্দর পৃথিবী দেখতে চাই।
.
আমি তোমার কানে সযতনে
একটু থাকতে চাই,
তোমার নাকের নোলক হয়ে
জীবন ক্ষুয়াতে চাই।
.
আমি তোমার গল্পে কিছু অংশে
জীবন বিলাতে চাই,
আমি তোমার ছন্দে তোমার গন্ধে
জীবন্ত হতে চাই।

.
আমি তোমার পায়ের নূপুর হয়ে
চলতে চাই কিছু পথ,
আমি তোমার গায়ে তোমার পায়ে
পেতে চাই প্রকৃতির অভিমত।
.
বলো করবে কি আমায় তোমার
চোখের কাজল-চুলের খোপা?
খুব নীরবে থাকবে যে আমি
শুধু তোমার জন্য হয়ে খোকা।

ঝিমোয়

যেভাবে ফুরোবে বিকেল, গন্তব্যহীন
বেঁচে থাকার মানে জানে জীবনের ঋণ।
ধুলো জমে থাকা রোজ বইয়ের পাতায়
বোবা টানেন তবু শুধু তোমাকে ই চায়।
পথ ভুলে ছিল যারা আগুনেতে রোজ
আমি জানি তারা তাই এখনো নিখোঁজ।
বসন্তের মত দিন আসে যায়
পুরনো বিকেলগুলো রোদ্দুর পায়।
বছরের প্রান্তরে পাগল প্রেমিক
দু'বাহু বাড়িয়ে বলে আসবেতো ঠিক।
বছর তো এলো গেল, বছর ঘুরে যায় 
শুধু ডাকবাক্সের গায়ে চিঠিরা ঝিমোয়।

মোহিনী

তোমায় রাখি মস্তিষ্কে
তোমায় রাখি মনে
তোমায় রাখি অস্তিত্বে
তোমায় রাখি পণে।
.
তোমায় রাখি সকল কাজে
উত্তম উদাহরণ করে,
তোমায় রাখি সকাল বেলায়
কীর্তনে ভরে।
.
তোমায় রাখি আপন আবরণে
তোমায় রাখি স্বচ্ছ
তোমায় রাখি খুব যতনে আমি
তোমায় রাখি উচ্চ।
.
তোমায় স্মরণ করি সম্মানের সহিত
বিনম্রতায় নেই নাম,
তোমার গুণাবলী যে আমাতে মোহিত
হবেনা তার বদনাম।

Sunday, 13 January 2019

বিদীর্ণ

এই নিশিতে আমি লিখতে চাই একটা গান
কিছু মান-অভিমান,
অবহেলায় অযতনে তুমি যে করেছ আমায়
তুচ্ছতাচ্ছিল্য অসম্মান।
.
বেশি কিছু তো কখনো চাইনি আমি
চেয়েছি শুধু একটু বন্ধুত্ব
দিয়েছ বেদনার মালা, দিয়েছ দূরত্ব।
.
খুব বেশি কিছু তো আবদার ছিল না আমার
ছিল শুধু কিছু কথা,
উত্তরে দিয়েছ আঘাত, দিয়েছ নীরবে ব্যথা।
পেয়েছি জীবনে স্থবিরতা।
.
স্মরণে পড়ে কি তোমার
আমাদের পরিচয় হওয়ার প্রথম দিনগুলো,
তুমি বলতে আমি ভীষণ ভালো ছেলে,
বলতে আমি সবার চেয়ে অন্য।
.
কোন সে কারণে আমাদের পথ আজ ভিন্ন?
আমাদের সম্পর্ক ছিন্ন।
জানি তুমি এর জবাব দিতে আজ হবে সংকীর্ণ।
.
তোমার কি মনে হয় না তুমি আমার
সুন্দর জীবন করেছ বিদীর্ণ।

Friday, 4 January 2019

উত্থান

সূর্যের আলোয় আলোকিত ধরা
পাখির কলতান
বৃষ্টিজলে মুছে যায় পায়ের চিহৃ
স্নান করে প্রাণ।
.
অস্থির সব চিন্তা-চেতনা আমার
এ তাজ্জব দেহে
বিলীন হয়ে যায় সকাল সন্ধ্যা
স্মতির বোজা বয়ে।
.
চোখের পাতায় মনের খাতায়
অসংখ্য কথা জমে
চলার পথে শূন্য হাতে আমায়
অকারণে দেয় থেমে।
.
মুক্ত আকাশ শান্ত বাতাস
ঋতু মেনে চলে
আমায় যেন অদৃশ্য স্বরে
পরিবর্তনের কথা বলে।
.
শুকনো ঘাসকে শিশির বিন্দু
সতেজ করেছে প্রাণ
আমায় প্রকৃতি বলছে কানে
তুমিও হও উত্থান।